ঢাকা মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২৬

দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠান: ভারতকে অবস্থান স্পষ্ট করতে বললেন প্রতিমন্ত্রী

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬

দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠান: ভারতকে অবস্থান স্পষ্ট করতে বললেন প্রতিমন্ত্রী

আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে এমন আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দণ্ডিত পলাতক আসামি হয়েও কী করে দিল্লিতে মত বিনিময়ে অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিতে চাইছেন, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে অবস্থান ‘স্পষ্ট’ করতে বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে এমন আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পর প্রথমবার কোনো অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে যাচ্ছেন বলে রোববার খবর প্রকাশ করে ইন্ডিয়া টুডে।

সেখানে বলা হয়, আগামী ৫ অগাস্ট নয়া দিল্লিতে ওই ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে; যে দিনটিতে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। নয়া দিল্লির ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ (এফসিসি সাউথ এশিয়া) এ সভার আয়োজন করেছে।

মতবিনিময় সভার আমন্ত্রণপত্রের বরাতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি শেখ হাসিনা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার ‘প্রস্তাবিত সময়সূচি’ নিয়ে আলোচনা করবেন।

এ বিষয়ে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আগামী ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছর পূর্তির দিনে দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশ সরকার আপত্তি জানাবে কি-না, সেই প্রশ্নে শামা ওবায়েদ বলেন, “আমরা আপত্তি কার কাছে জানাব? উনি একটা নিষিদ্ধ সংগঠন, সেই সংগঠনের প্রধান, যে অনেক ধরনের ক্রাইমে সাজাপ্রাপ্ত আসামি। উনি কোথায় কী বলছেন না বলছেন, বাংলাদেশ সরকারের সেই সময় নেই, সেটার জবাব দেওয়ার।

“কিন্তু আমরা যেটা ফলো করছি যে, ভারত সরকারও সম্প্রতি কিন্তু একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছে যে, তারা আশা করে না যে ওখানকার পলাতক একজন আসামি রাজনৈতিক কোনো কথা বলবে বা রাজনৈতিক বক্তব্য দেবে। সেটা ভারত সরকার সমর্থন করে না। তারা (আওয়ামী লীগ) অনলাইন মিটিং করবে বা যেটাই করবে, সেটা ভারত সরকার সমর্থন করে কি, করে না, সেটা ভারত সরকারকেই স্পস্ট করতে হবে।”

এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও সম্প্রতি জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োডো নিউজকে দেওয়া পরপর দুটি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আসার কথা বলেছিলেন।

আগামী ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠান ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সম্প্রতি ভারতের সংসদীয় কমিটির একটি প্রতিবেদনের বিষয়ও সামনে আসছে। যেখানে দুই দেশের সম্পর্ক এগোনোর স্বার্থে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাইরে রাখার বিষয় উঠে আসার কথা বলা হয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।

ওই প্রতিবেদন নিয়ে এক খবরে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ভারতের ভূখণ্ড থেকে অন্য দেশকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়ার কঠোর নীতিতে অবিচল থাকার মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে সরকারের যে অবস্থান, তা তুলেছে ধরেছে সংসদীয় কমিটি।

ভারত সরকার কমিটিকে বলেছে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা কোনো সুযোগ তারা শেখ হাসিনাকে দিচ্ছে না।

দেশটির সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন থেকে এমন বক্তব্য এলেও দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তৃতার আয়োজক এফসিসি সাউথ এশিয়ার সভাপতি ওয়ায়েল আউয়াদ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছেন, “ওই আয়োজনের বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো আপত্তি নেই।”

শেখ হাসিনার বক্তৃতার আয়োজন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কি না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “করতে পারে, কিন্তু সেটা তো আমরা চাচ্ছি না।

“আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষও চায় না। বাংলাদেশও চায় না যে, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো নেতিবাচক হোক। আমরা চাই আরো উন্নত হোক এবং উন্নতির দিকেই যাচ্ছে। সুতরাং সেটা মাথায় রেখেই ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম চালাবে।”

সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে শামা ওবায়েদ বলেন, “আমরা ভবিষ্যৎমুখী একটা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছি ভারতের সাথে। সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হোক, আমরাও চাই না এবং আমার গভীর বিশ্বাস যে, ভারতও চায় না। সুতরাং এটা ভারতকেই স্পষ্ট করতে হবে যে, তারা সমর্থন দিচ্ছে কি না।”

এর আগে দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ঢাকায় ভারতীয় দূতকে তলব করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এবারও আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার বক্তৃতার আয়োজনের প্রতিবাদ জানানো হবে কি না প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি সরকার আসার পরও দ্বিপাক্ষিক সব আলোচনা এবং লিখিত বার্তায় ভারত সরকারের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

“সুতরাং ভারতে যেহেতু এখন এরা আশ্রিত আছে, পলাতক আছে, এটা ভারত সরকারকেই স্পস্ট করতে হবে। এটার দায়দায়িত্ব আমাদের নয়।”

৫ অগাস্টের আয়োজন নিয়ে ভারতের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হবে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, “এটা ভারত সরকার করছে না।”

কিন্তু অনুষ্ঠান তো ভারতে হচ্ছে–সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যদি আমরা প্রয়োজন মনে করি, তাহলে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করব।”

সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অতিথি হিসাবে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি।

শেখ হাসিনার বক্তৃতার আয়োজন ওই আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে প্রভাবিত করবে কি না, সেই প্রশ্নে শামা ওবায়েদ বলেন, “সেটা সময়ই বলে দেবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন দায়িত্ব নিয়েছেন, উনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তখনও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকে দাওয়াতপত্র এসেছিল।

“উনি উনাকে (তারেক রহমান) পরিবারসহ আমন্ত্রণ করেছিলেন। এখন আবার ব্রিকস থেকেও আমন্ত্রণ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর তো বাংলাদেশের কাজে ২৪ ঘণ্টাই ব্যয় করছেন। ফলে সেটা সময় বলে দেবে, কখন, কোথায়, কীভাবে উনি কোন দেশে সফর করবেন।”

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসাবে। ওই আমন্ত্রণপত্রে তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সম্বোধন করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এটা কোনো আলোচনার বিষয় নয়।”

ভারতের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে ঢাকার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ নিয়ে করা এক প্রশ্নে শামা ওবায়েদ বলেন, “বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম দিনই যখন আমি এই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসি, বলেছিলাম যে বাংলাদেশ এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখে।

“বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে বিনিয়োগ হবে, সবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। সব দেশ এখানে এসে বিনিয়োগ করবে, সেটাই আমরা চাই।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের এখন যে মেনিফেস্টো, সেই মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বদ্ধপরিকর। সেটার জন্য আমরা সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। ভারত, চীন- সবার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ থাকবে, সম্পর্ক থাকবে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকবে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও থাকবে।”

বার্তাজগৎ২৪

Link copied!