ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
ডাক্তার বাণিজ্য,

মেডিকেল টেস্টে হয়রানির চরম পর্যায়ে কাতার মেডিকেল সেন্টার

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬

মেডিকেল টেস্টে হয়রানির চরম পর্যায়ে কাতার মেডিকেল সেন্টার

মেডিকেল পেন্ডিং, রিভিজিট, রিপোর্ট ডিলে—এ ধরনের সমস্যায় চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন কাতার গমনেচ্ছু কর্মীরা। এমনই অভিযোগ উঠেছে কাতার মেডিকেল সেন্টারের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশে কাতার ভিসার জন্য নির্ধারিত মেডিকেল পরীক্ষা ও বায়োমেট্রিক কার্যক্রম ঢাকার বাংলামোটরস্থ কাতার ভিসা সেন্টারের অধীনে কাতার মেডিকেল সেন্টার করে থাকে। যেখানে প্রয়োজনীয় সেবার মধ্যে রয়েছে মেডিকেল টেস্ট, এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা এবং বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট।

সাম্প্রতিক সময়ে কাতারগামী কর্মীদের মেডিকেল ফিটনেস পরীক্ষাকে ঘিরে কাতার মেডিকেল সেন্টারের বিরুদ্ধে চরম মাত্রায় হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি ধাপে এই হয়রানির শিকার হতে হয় বলে উল্লেখ করেন ভুক্তভোগীরা।

কাতার মেডিকেল সেন্টারে প্রথম বিতর্ক শুরু হয় সাধারণ এবং ভিআইপি সার্ভিস নিয়ে। যাত্রীদের অভিযোগ, সাধারণভাবে মেডিকেল করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। অপরদিকে ৪,২৬০ টাকা বেশি দিয়ে ভিআইপি সিস্টেমে মেডিকেল করলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

ভিআইপি পদ্ধতিতে মেডিকেল করানোর ক্ষেত্রে ৪,২৬০ টাকা অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি কাতার মেডিকেল সেন্টারের আবেদন ফরমের নিচের অংশে কৌশলে উল্লেখ করা রয়েছে।

তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক যাত্রীকে মেডিকেলে আনফিট দেখিয়ে একই ব্যক্তির কাছ থেকে রিভিজিটের মাধ্যমে কয়েক দফায় টাকা নিয়ে বারবার পার্ট মেডিকেল বা ল্যাব নিশ্চিতকরণ পরীক্ষার নামে হয়রানি করা হয়।

এক্ষেত্রে একেকজন কর্মীর অনেক মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকবার ঢাকায় আসা-যাওয়ার হয়রানিসহ শারীরিক কষ্টের কথা তুলে ধরেন অনেকেই।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেডিকেলে আনফিট ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে তাদের মনোনীত ডাক্তার দেখানোর জন্য বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

যেখানে ১,৫০০ টাকা ভিজিটের মাধ্যমে ইম্পেরিয়াল প্রাইভেট হেলথ কেয়ার লিঃ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে ভবনটির নবম তলায় এই ডাক্তার দেখানোর কার্যক্রম চলে। একবার ডাক্তার দেখালে তাকে ওষুধ খেয়ে বা রিপোর্ট নিয়ে আবারও ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়।

এভাবে একাধিকবার শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শ ফি বাবদ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কাতার মেডিকেল সেন্টারের বিরুদ্ধে।

সাধারণত যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ত্রুটি থাকার কারণে বিদেশগামী কর্মীদের মেডিকেলে আনফিট করানো হয়, কর্মীদের অভিযোগ, সেগুলোর বাইরে অনেক তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রেক্ষিতেও অনেককে আনফিট করে তাদের মনোনীত ডাক্তার দেখানোর জন্য পাঠানো হয় বেশিরভাগ সময়।

এক্ষেত্রে ভবনটির নবম তলায় ইম্পেরিয়াল রিক্রুটিং এজেন্সির একটি অফিস রুমে অসংখ্য কাতারগামী কর্মীর ভিড় দিনব্যাপী পরিলক্ষিত হয়।

বেশ কিছু কর্মীর সঙ্গে প্রতিবেদকের সরাসরি কথোপকথনের এক পর্যায়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান, তার শরীরে থাকা একটি ছোট দাগকে দাউদ বলে চিহ্নিত করে তাদের মনোনীত চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। এক সপ্তাহ পরে আবারও তিনি এই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে কাপড় আয়রন করার সময় হাতে তাপ লেগে পোড়া দাগটি সৃষ্টি হয়। যা হয়তো কখনোই তার শরীর থেকে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু এই দাগটিকেই দাউদ হিসেবে গণ্য করে তাকে ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়। দুইবার ডাক্তার দেখানোর পর এখন তাকে ফিট বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেকজন কর্মী জানান, তার চোখে কখনোই কোনো সমস্যা ছিল না, এখনো নেই। তারপরও তাকে ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়। ডাক্তারের কাছে দুইবার যাওয়ার পর এখন তিনিও ফিট।

ডাক্তার দেখানোর সময়সূচির বিলম্ব নিয়েও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ডাক্তার পাঁচটায় আসার কথা থাকলেও আসেন সাড়ে ছয়টার পরে। যে কারণে ডাক্তার দেখাতে দেরি হওয়ায় তিনি ওই রাতে চট্টগ্রাম ফিরে যেতে পারেননি।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এ ধরনের ঘটনা শুধু তার সঙ্গেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আরও অনেকের সঙ্গে প্রতিদিনই ঘটে চলেছে।

একাধিকবার পার্ট মেডিকেল করতে আসা, তথা তাদের ভাষায় রিভিজিটে আসা আরও কয়েকজনের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হলে তারা সরাসরি এটাকে হয়রানি বলে উল্লেখ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২২ বছর বয়সী একজন ভুক্তভোগী রাত সাড়ে নয়টায় কাতার মেডিকেল সেন্টারে মেডিকেল করা শেষে বাড়িতে গিয়ে পরদিন সকাল ১০টার দিকে মোবাইলের মেসেজে দেখতে পান, সকাল ১১টায় ডাক্তার দেখানোর সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

উপায় না দেখে তিনি আবার ছুটে আসেন ঢাকায়। আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে ১,৫০০ টাকা ভিজিটে ডাক্তার দেখিয়ে অতিরিক্ত আরও ৩,০০০ টাকা দিয়ে ইউরিন পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল দেন।

শুধুমাত্র মেডিকেলে আনফিট করে দেওয়ার ভয়ে এরকম হয়রানির শিকার হওয়া অনেকেই মুখ খুলতে চান না বলেও মন্তব্য করেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে কর্মীদের একজন বলেন, এক-দুইবার নয়, এখানে ৮-১০ বার আসারও প্রয়োজন হতে পারে।

এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযোগ হলো, মেডিকেল করানোর পর রিপোর্ট ডেলিভারির ক্ষেত্রে অনেক সময় দীর্ঘ সময় নেওয়া হয়। যে কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারও কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।

এই ধরনের ঘটনা কর্মীদের সঙ্গে ঘটলেও ফেসবুকভিত্তিক কাতার ভিসা সেন্টারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাবি করা কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, ২০২৬ সালে কোনো টেনশন ছাড়াই মেডিকেলে ফিটনেসের নিশ্চয়তা দিচ্ছে তারা।

এমনই একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জুবায়ের নামে একজন বলেন, মেডিকেল করানোর ৪৮ ঘণ্টা আগে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ১৪,০০০ টাকার প্যাকেজের বিনিময়ে যেকোনো শারীরিক সমস্যা থাকলেও মেডিকেলে ফিট করে রিপোর্ট অনলাইন করে দেবেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।

তিনি প্রতিবেদকের কাছে নিজেকে কাতার ভিসা সেন্টারের আইটি সেক্টরে কর্মরত বলে পরিচয় দেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় পাঁচশোর মতো মেডিকেল টেস্ট করানো হয় এই সেন্টারে। এক্ষেত্রে মেডিকেল টেস্টের সঠিক রিপোর্ট প্রদানের সক্ষমতার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এসব বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পাবলিক রিলেশন বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী রিফাত নামে একজন জানান, “এখানে আমাদের তেমন কিছু করার নেই। যা কিছু হয়, তা সবই কাতার থেকে নিয়ন্ত্রিত।”

কারও শারীরিক সমস্যা থাকলে তার সুবিধামতো সংশ্লিষ্ট বিভাগের যেকোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পছন্দমতো না দেখিয়ে তাদের নির্দেশিত ডাক্তার দেখাতে হয় কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই ডাক্তারগুলো তাদের নিয়োগকৃত।

যেখানে দেশের বড় বড় ডিগ্রিধারী সিনিয়র ডাক্তারদের ভিজিট ৮০০-১,০০০ টাকা, সেখানে আপনাদের নিয়োগকৃত অপেক্ষাকৃত জুনিয়র এবং কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডাক্তারদের ভিজিট ১,৫০০ টাকা কেন—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।

ওয়েবসাইটে কাতার মেডিকেল সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে স্টিমজ হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা দেখা গেলেও, বর্তমানে কাতার মেডিকেল সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কতটুকু সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে কাতার গভর্নমেন্ট কন্টাক্ট সেন্টারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো রিপ্লাই পাওয়া যায়নি।

ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে কর্মীদের যাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেল টেস্টের বিষয়ে কাতার মেডিকেল সেন্টারের মতো এত বেশি পরিমাণ ভোগান্তি আছে কি না, এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, বিদেশগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রে কোনো রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তাকে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। তিনি তার সুবিধামতো ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে সংশ্লিষ্ট অসুবিধার চিকিৎসা নিতে পারেন।

এখানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার দেখাতে বাধ্য করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মূলত এই ভোগান্তি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে হয়রানিমূলকভাবে ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কাতার মেডিকেল সেন্টারে হয়রানির শিকার হয়ে এক পর্যায়ে কাতার যাওয়ার ইচ্ছাটাকেই বদলে ফেলেছেন কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কাউকে কাউকে পোস্ট করতেও দেখা গেছে।

এভাবে চলতে থাকলে দেশের রেমিট্যান্স খাতে একটু হলেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সদয় হস্তক্ষেপসহ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে কাতার গমনেচ্ছু যাত্রীদের জন্য হয়রানিমুক্ত মেডিকেল টেস্ট নিশ্চিত করার দাবি সংশ্লিষ্ট সকলের।

বার্তাজগৎ২৪

Link copied!