জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) যোগদানের পর থেকেই মো. এনামুল হকের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০০৭ সালে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকায় কোটি টাকা মূল্যের কয়েকটি ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় কয়েক বিঘা জমি, বগুড়া শহরে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জায়গা এবং স্ত্রী ও নিজের নামে ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে এনামুল হকের।
বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার বিহি গ্রামে এনামুল হকের বাড়ি। তার বাবা ছিলেন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। চার ভাইবোনের মধ্যে এনামুল হক সর্বকনিষ্ঠ। অভিযোগকারীদের দাবি, বিএমইটিতে যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সূত্রমতে, রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বরের এ ব্লকের ৩ নম্বর সড়কের ২ নম্বর হোল্ডিংয়ে সাততলা ভবনের সপ্তম তলায় প্রায় ১০ বছর আগে দুটি ফ্ল্যাট কেনেন এনামুল হক। ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ওই বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতেন বলে জানা গেছে। আড়াই কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনটি গ্রিনওয়ে প্রপার্টিজ লিমিটেড নামের একটি আবাসন কোম্পানি নির্মাণ করে। ভবনটির নাম ‘রানী মহল’।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, একই ভবনের পঞ্চম তলায় আরও একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন এনামুল হক। ওই ফ্ল্যাটটি তার ভাই শাহিনের নামে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকার ২৮১/১২/এ হোল্ডিংয়ের ১০ তলা বিশিষ্ট যমুনা ভবনের অষ্টম তলায় পশ্চিম পাশের একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন এনামুল হক। সূত্রমতে, ২০২০ সালে প্রায় ৬৩ লাখ টাকায় তিনি সেটি একজন শিক্ষকের কাছে বিক্রি করে দেন।
আরও জানা গেছে, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় চিটাগাং হোটেলের অপর পাশে তার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। সেখানে তিনি বর্তমানে পরিবারসহ বসবাস করেন বলে সূত্রের দাবি।
বগুড়ার গ্রামের বাড়িতে কয়েক বিঘা জমি কেনার পাশাপাশি বগুড়া শহরের রেলগেটের অদূরে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১৬ শতাংশ জমিও কিনেছেন এনামুল হক—এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এনামুল হকের বিরুদ্ধে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সূত্রমতে, ২০১৫ সালে শাহজাহান কবির নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যৌথভাবে ফার্নিচার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ২০১৬ সালে দুজনের নামে ট্রেড লাইসেন্স করা হয়। পরে ২০১৮ সালের জুনে আগারগাঁওয়ের তালতলা বাসস্ট্যান্ডের কাছে যৌথভাবে আরেকটি ফার্নিচার শোরুমে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব নেন এনামুল হক। সেখানেও কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।
ফার্নিচার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে শাহজাহান নামে ওই ব্যক্তি ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শেরেবাংলা নগর থানায় এনামুল হকের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে এনামুল হকও বাদী হয়ে ঢাকার আদালতে শাহজাহান কবিরের বিরুদ্ধে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা করেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।
সেই সময় বিএমইটিতে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে—এনামুল হক কি ব্যবসায়ী, নাকি সরকারি চাকরিজীবী? তার টাকার উৎস নিয়েও দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, কর্তৃপক্ষ তখন বিষয়টি আমলে নেয়নি।
এখন আবার প্রশ্ন উঠেছে—এনামুল হকের অর্থের উৎস কী?
অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এনামুল হক। সাম্প্রতিক সময়ে তার অবৈধ কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি বহির্গমন শাখার সৌদি শাখায় যোগদানের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার অবৈধ ম্যানপাওয়ার দিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সূত্রমতে, এসব ম্যানপাওয়ার দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় সিওসি ছাড়া ম্যানপাওয়ার দেওয়া, গ্রুপ ভেঙে ম্যানপাওয়ার দেওয়া এবং এক এজেন্সির কাজ অন্য এজেন্সির নামে করানোসহ নানা অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। এমনকি নিয়মবহির্ভূতভাবে ম্যানপাওয়ার করার ক্ষেত্রে শুক্র ও শনিবারও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে জানতে এনামুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি অডিট টিমের সঙ্গে আছেন, পরে কথা বলবেন। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনও মতামত পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকেও খুদে বার্তা পাঠানো হয়, তবে তিনি সাড়া দেননি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাদের মতে, অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এনামুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিএমইটি কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে যথাযথ অনুসন্ধান করা উচিত। তদন্তের মাধ্যমে তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, নামে-বেনামে থাকা সম্পদ এবং সাম্প্রতিক ম্যানপাওয়ার-সংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন :