ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক মিরাজ’ পরিচয়ে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিল ডেভিড ইমন

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২৬

পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক মিরাজ’ পরিচয়ে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিল ডেভিড ইমন

চুল ও গোঁফ কেটে চেহারায় আনা হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার হওয়া। ডিবির তল্লাশিচৌকিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দাবি করছিলেন পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক’, তার নাম বলেছিলেন ‘মিরাজ’। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। চাতুরতা আর ছদ্মবেশের আড়ালে থাকা চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সকালে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ভারতের পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যশোর সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

গ্রেপ্তারের সময়কার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বারবার নিজের নাম-পরিচয় ও বাসস্থান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন এক যুবক। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, এই ‘মিরাজ’-ই আসলে চট্টগ্রামের সেই ডেভিড ইমন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের মোহাম্মদ মুছার ছেলে মোবারক হোসেনের অপরাধজগতে হাতেখড়ি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ফটিকছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের শিষ্য হিসেবে এলাকায় ছিচকে চুরি এবং ধুরুং খাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। জড়িয়ে থাকতেন মারামারি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায়।


তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর ফটিকছড়িতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে ভোল পাল্টান মোবারক। এলাকা ছেড়ে ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে এক সন্ত্রাসীর হাত ধরে পাড়ি জমান চট্টগ্রাম শহরে। মোবারক থেকে নিজের নাম বদলে করে হয়ে যান ‘ডেভিড ইমন’। এরপর যুক্ত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপে। পুলিশ জানায়, ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরো বাহিনীর দায়িত্ব চলে যায় ডেভিড ইমনের হাতে। তিনি বনে যান বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।

খুনের পর খুন ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফটিকছড়ি থেকে শহরে আসার পরই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ডেভিড ইমন। তার বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা ও দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানা এলাকায় আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রথম তদন্তে আসে ডেভিড ইমনের নাম। গতবছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় সংঘটিত আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন ইমন। একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ খুনের মামলার তদন্তেও ইমনের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ। চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে চট্টগ্রামের একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ফোন করে ডেভিড ইমনের নামে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। চন্দপুরা এলাকার ‘ডিডিএন’ ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ২ কোটি টাকা এককালীন ও মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

এছাড়া গত সপ্তাহে বড়দিঘির পাড় এলাকার এক আবাসন ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা এবং জিইসি এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি করে ব্যবসা বন্ধের হুমকি দেন তিনি।

পুলিশ জানায়, গত ২৬ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪) নামে ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডেভিড ইমনের চাঁদাবাজি সাম্রাজ্যের তথ্য ফাঁস করে দেয়। মূলত তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই নিশ্চিত হওয়া যায় ইমনের অবস্থান। এরপরই যশোর জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অবস্থায় গ্রেপ্তার করে। তবে অভিযানের সময় ইমনের আরেক সহযোগী রায়হান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল দীর্ঘদিন ধরে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে নজরে রাখছিল। তিনি প্রথমে ঢাকায় আত্মগোপন করেছিলেন, সেখানেও অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরা সম্ভব হয়েছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকালে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের অপরাধ ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

বার্তাজগৎ২৪

Link copied!