বিএমইটির ম্যানপাওয়ার সেক্টরের অঘোষিত ডন হিসেবে পরিচিত সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) বর্তমান পরিচালক কর্মসংস্থান মাসুদ রানা আড়ালে থেকে হাজার কোটি টাকার মাফিয়া চক্রে যোগ দিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিসংখ্যান কর্মকর্তা থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পরিচালক পদ বাগিয়ে নেন তিনি। চাকরির আড়ালে ম্যানপাওয়ার ব্যবসা কে পারিবারিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে নিজের ভাইকে লাইসেন্স করিয়ে দিয়েছেন মাসুদ রানা। লাইসেন্সের নাম ফারহান ওভারসিজ। আর এল নাম্বার ২৫৯৫।আপন ভাতিজা রাইসুল ইসলাম তুহিনকে বাংলাদেশ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির ম্যানেজিং ডিরেক্টর বানিয়ে দেন পরিচালক মাসুদ রানা।যার আর এল নাম্বার ১৫৫৫। আর এরপর থেকেই মূলত শুরু হয় চাচা ভাতিজার আসল কর্মকান্ড।
কলেজ জীবন থেকেই চাচা মাসুদ রানার বাসায় বসবাস ভাতিজা তুহিনের। ভাতিজাকে ব্যবসায়িক মহলে বিশেষভাবে পরিচয় করিয়ে দিতেন মাসুদ রানা।পাসপোর্টে ইমার্জেন্সি কন্ট্যাক্ট পারসন হিসেবে মাসুদ রানার নাম ব্যবহারের সুযোগ করে দেন মাসুদ রানা নিজেই। মূলত মাসুদ রানার এই পরিচয় কে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার শক্ত ছক আঁকেন রাইসুল ইসলাম তুহিন, যার নেপথ্যে নায়ক হিসেবে কাজ করেন পরিচালক মাসুদ রানা।প্রতারণার ফাঁদকে শক্ত করতে চাচা মাসুদ রানাকে আড়ালে রেখে চার সদস্যের শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলে ভাতিজা তুহিন,যেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে খোরশেদ আলম, মাসুদ রানা সহ একাধিক ব্যক্তি। মেহেরপুর জেলার আব্দুল হাকিম মিয়ার পুত্র মোহাম্মদ বাতেন নিজ এলাকা থেকে শত শত মানুষের লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে পালিয়ে আসে ঢাকায়। ঢাকায় এসে রাতারাতি নাম পরিবর্তন করে হয়ে যায় খোরশেদ আলম। পরবর্তীতে ওয়ার্কার ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো খোরশেদ আলম এর সাথে পরিচয় হয় সেই সময় মালয়েশিয়ায় অবস্থান করা রাইসুল ইসলাম তুহিনের।শুরু হয় প্রতারণার নতুন কৌশল।
মালয়েশিয়ার কলিং ভিসার কাজ দেওয়ার নাম করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় রাইসুল ইসলাম তুহিন এবং খোরশেদ আলম, যেখানে আড়ালে থেকে পূর্ণ সমর্থন দিতে থাকেন মাসুদ রানা এমন ই অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগীর। প্রতারিত হওয়া ওই ভুক্তভোগী প্রতিবেদককে বলেন মাসুদ রানার ভাতিজা রাইসুল ইসলাম তুহিন তার থেকে মালয়েশিয়ার ভিসা দেওয়ার কথা বলে ৪ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা নেয়। এই টাকার বিনিময়ে চেকও দেয় তাকে। চাচা মাসুদ রানার রেফারেন্স দেওয়াতেই মূলত ভুক্তভোগী, প্রতারক তুহিন এর সাথে এত বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনে রাজি হন। এমনকি টাকা লেনদেনের কিছু সময় আগ পর্যন্ত সেখানে মাসুদ রানার উপস্থিত থাকার কথা ছিল বলে জানান ভুক্তভোগী নিজেই।প্রতারণার সুবিধার্থে খোরশেদ বিদেশেই অবস্থান করতেন বেশিরভাগ সময়, দায়িত্ব ছিল এটেস্টেশনের। আর দেশে থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজ করেছেন তুহিন। দুই প্রতারক একই ডিমান্ড লেটার ৪ থেকে ৫ জনের কাছে বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ব্যবসায়িক মহলে জনশ্রুতি আছে মূলত চাচা মাসুদ রানার সহযোগিতায় এমন বড় ধরনের প্রতারণা করেছে ভাতিজা রাইসুল ইসলাম তুহিন।এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য দিশারী ইন্টারন্যাশনাল এর মালিক মোঃ রিপন সাহেবের নিকট থেকে মালয়েশিয়ার কাজ দেওয়ার কথা বলে ৫০০ জন ওয়ার্কার এর বিপরীতে ভুয়া এলোকেশন দিয়ে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পাওয়া যায়।এজেন্ট মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ৩০০ ওয়ার্কারের জন্য ভুয়া ভিসা দিয়ে ৪ কোটি ৭৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় রাইসুল ইসলাম তুহিন। এছাড়া আল ইসলামের নিকট থেকে ৩ কোটি মল্লিক রিক্রুটিং এজেন্সির নিকট থেকে ৪ কোটি, কাপাসিয়ার নিকট থেকে ৭ কোটি টাকা সহ আরো অসংখ্য এজেন্সির নিকট থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পাওয়া যায়।এদের প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক এজেন্সি পথে বসার উপক্রম। উল্লেখ্য পরিচালক মাসুদ রানা এই সিন্ডিকেটের ম্যানপাওয়ার সেক্টরের সকল কাজের সমাধান দাতা ছিলেন। এই সিন্ডিকেটের উল্লেখযোগ্য আরেকজন সদস্য হচ্ছে কনসোলার ফাহাদ বসুনিয়া। এই কয়েকজনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মূলত মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া এসকল দেশের ক্ষেত্রে ভয়াবহ ভূমিকা পালন করেছে এই সিন্ডিকেট। দেশ থেকে সবথেকে বেশি পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে অবশেষে সপরিবারে কাতার পাড়ি জমান সর্বজন স্বীকৃত প্রতারক রাইসুল ইসলাম তুহিন, যিনি মূলত পরিচালক মাসুদ রানার আপন ভাতিজা।
মাসুদ রানা ভাতিজা তুহিনকে ব্যবহার করে ম্যানপাওয়ার ব্যবসার শক্ত জাল বিছিয়েছিলেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়,যা এখনও চলমান থাকার জনশ্রুতি আছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাসুদ রানার একজন বিশ্বস্ত কালেক্টর এই প্রতিবেদক কে জানান প্রতি সপ্তাহে তিনি নিজে কয়েকটি ওভারসিজ থেকে তিন থেকে চার লক্ষ টাকা কালেকশন করতেন মাসুদ রানার নির্দেশে এবং তা জমা দিতেন মাসুদ রানার নির্দেশিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, এছাড়াও শেয়ার মার্কেটের একটি ট্রেডিং হাউজেও মাসুদ রানার টাকা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। দুদকের মামলায় অভিযুক্ত একটি ওভারসিজ এর মাধ্যমে ৩৭৯৭জন প্রবাসী থেকে অতিরিক্ত ৬৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯৭৫০০ টাকা গ্রহণের যে অভিযোগ পাওয়া গেছে সেখানে, ওই কর্মীদের সরকার নির্ধারিত ফি এর বাইরে ম্যানপাওয়ার বাবদ একটা অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে,যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পরিচালক মাসুদ রানা। অতিরিক্ত এই অর্থের যোগান দিতে প্রবাসীদেরকে ক্ষেত্রবিশেষে জায়গা জমি বিক্রি,সম্পদ বিক্রি করে টাকার যোগান দিতে হয়েছে। মাসুদ রানাদের মত দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের জন্যই এ ধরনের এজেন্সি গুলো অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। দুর্নীতির মাধ্যমে মাসুদ রানা কয়েক শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে সূত্র মতে জানা যায়। রাজধানীর আগারগাঁও, ধানমন্ডি গুলশান নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কয়েকটি ফ্ল্যাট সহ বিভিন্ন জায়গায় মাসুদ রানার রয়েছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল দামি ফ্ল্যাট। এছাড়া উত্তরা এলাকায় দুটি বাড়ি, সাভারে প্রায় ৫০ বিঘা জমি এবং গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণায় বিলাসবহুল বাড়ি, জমি থাকার কথা উল্লেখ করে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জনৈক ব্যক্তি একটি অভিযোগ করেছেন গত ১২ ই মে। অভিযোগসূত্রে আরও জানা যায় মালয়েশিয়াতে নির্মাণ করেছেন শত কোটি টাকা মূল্যের সেকেন্ড হোম। তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে বলে অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। দুবাইতে জনৈক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের সাথে জনশক্তি ব্যবসা রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন এবং একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের ও অভিযোগ পাওয়া যায়।
দুদকের মামলায় অভিযুক্ত নির্দিষ্ট ওই ওভারসিজ এর মানি লন্ডারিং কর্মকান্ডে মাসুদ রানা দায় এড়াতে পারেন কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়াও আরো একাধিক এজেন্সিকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে ম্যানপাওয়ারের কাজ করে দেওয়ার অভিযোগ আছে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে।
কম্বোডিয়ার ম্যানপাওয়ার নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য কম্বোডিয়ার ম্যানপাওয়ার করিয়ে দিয়েছেন এই মাসুদ রানা বলে সূত্রমতে জানা যায়।কম্বোডিয়াতে যেয়ে দেশের অসংখ্য নিরীহ যুবক বাধ্য হয়ে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করেছে, কাজ করতে রাজী না হলে অনেক অত্যাচারের শিকার হয়েছে। এক পর্যায়ে কম্বোডিয়া সরকারের অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মুক্ত হয় অনেক বাংলাদেশী যুবক। পরবর্তীতে ব্রাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সহযোগিতায় দেশে ফিরে আসে সে সকল অসহায় যুবকরা।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে।
সকল বিষয়ে পরিচালক মাসুদ রানার সাথে কথা বলতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।তার মুঠোফোনে তার সম্পর্কিত অভিযোগ সম্পর্কে মতামত জানতে খুদে বার্তা পাঠালে সেখানেও কোন মতামত জানাননি।
এরকম দায়িত্বশীল একটি পদে থেকে, মাসুদ রানার মত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিভাবে নিজেকে মাফিয়া চক্রের সিন্ডিকেটের ভিতরে জড়াতে পারেন সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এবং তার দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করলে মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট সহ,এদেশের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু প্রতিবন্ধকতার আরো অনেক তথ্য বের হয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একই সাথে মাসুদ রানার মত কর্মকর্তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত পরবর্তী পর্বে।

আপনার মতামত লিখুন :