ফেনীতে বৃষ্টি নামলেই বন্যার আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সাধারণ মানুষ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফিরছে জেলার বাসিন্দাদের। সেই দুর্যোগের ক্ষত পুরোপুরি না শুকাতেই ফের বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটছে তাদের।
টানা ভারী বর্ষণ এবং ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সম্ভাবনায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। আকাশে ঘন কালো মেঘ আর মুহুরী নদীর বাড়তে থাকা পানি দেখে জেলার লাখো মানুষের এখন একটাই প্রার্থনা, ২০২৪ সালের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
রোববার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী ৫ থেকে ১২ জুলাই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই পূর্বাভাস প্রকাশের পর থেকেই নতুন করে বন্যা আতঙ্কে দিন কাটছে ফেনীবাসীর।
এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় জেলার ছয়টি উপজেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। প্রাণ হারান অন্তত ২৯ জন। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় লাখো মানুষকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছিল। সেই ট্রমা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেকেই। বিশেষ করে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মানুষ নদীর পানি সামান্য বাড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরশুরামের সাতকুচিয়া এলাকার বাসিন্দা মহি উদ্দিন বলেন, গতবারের বন্যায় আমাদের ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। ধারদেনা করে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছি। দুই দিন ধরে যেভাবে মেঘ ডাকছে আর বৃষ্টি হচ্ছে, তাতে বুক কাঁপছে। আবার যদি পানি ঢোকে, তাহলে আমাদের আর বাঁচার উপায় থাকবে না।
পরশুরামের বাসিন্দা আজিজুল হক হাসান বলেন, বৃষ্টি মানেই পরশুরামবাসীর নির্ঘুম রাত। বন্যার পূর্বাভাসের পর থেকে বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে আরও বেশি উদ্বেগে আছি। সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ দিলেও কহুয়া-মুহুরী বাঁধের স্থায়ী নির্মাণকাজ এখনও শুরু হয়নি। তাই শঙ্কা আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের বন্যায় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর যেসব রক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এখনও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়নি। আপাতত জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা বাঁধগুলো এবারের পাহাড়ি ঢলের চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাঁধ ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় নদীপাড়ের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
ফুলগাজী উপজেলার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ইয়াছিন কালবেলাকে বলেন, গত বন্যায় আমি সর্বস্ব হারিয়েছি। আবার যদি বন্যা হয়, তাহলে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সোহাগ কালবেলাকে বলেন, বর্ষা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। সবার মনে একটাই ভয়, আবার যদি ২০২৪ সালের মতো বন্যা হয়, তাহলে হয়তো সবকিছু হারাতে হবে।
এদিকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার মজুত এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানির উচ্চতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল এলে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতনু বড়ুয়া কালবেলাকে বলেন, এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মনিটরিং করছি। নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ফেনীসহ পাঁচ জেলার জন্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের একটি বিশেষ পূর্বাভাস রয়েছে। বর্তমানে জেলায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আমরা সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক কালবেলাকে বলেন, নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। সীমান্তের ওপারে বৃষ্টিপাতের অবস্থাও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার মজুত এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো দুর্যোগ দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।

আপনার মতামত লিখুন :