রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সমবায় অধিদফতরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দাপট কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার, বদলি, নিয়োগসহ অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে এখনও এই সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তাদের অভিযোগ, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বলয় এখনও অধিদফতরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এই পাঁচজনকে ‘আওয়ামী পঞ্চরত্ন’ বলেও উল্লেখ করছেন।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তারা হলেন—ঢাকা জেলা সমবায় অফিসার মো. আল-আমিন, উপনিবন্ধক (প্রশাসন) মোছা. নূর-ই-জান্নাত, যুগ্ম নিবন্ধক মো. কামরুজ্জামান, সমবায় অধিদফতরের ফাইন্যান্স শাখার উচ্চমান সহকারী মিতা এবং অফিস সহকারী মো. নাজমুল।
অধিদফতরের একাধিক সূত্র বলছে, টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি এবং নতুন নিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে এই পাঁচজনের প্রভাব রয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়মিত কাজ পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনও বেশিরভাগ টেন্ডার পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘পদোন্নতির সুপারিশ হলেও নাম বাদ দেওয়া হয়’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদফতরের একজন অতিরিক্ত নিবন্ধক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে তাকে দীর্ঘদিন নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, নিয়মিত পদোন্নতি থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং একাধিকবার সুপারসিড করা হয়েছে। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি বা ডিপিসি তার পদোন্নতির সুপারিশ করলেও ‘বিএনপি করেন’—এমন অভিযোগ তুলে তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, তিনি যেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা জানাতে না পারেন, সে জন্যও বিভিন্নভাবে বাধা ও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
২০১৫ সালের চিঠি ঘিরে পুরোনো হয়রানির অভিযোগ
অনুসন্ধানে ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির একটি চিঠির তথ্য পাওয়া গেছে। সমবায়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন মহাসচিব মতিউর রহমানের সই করা ওই চিঠিতে বিএনপি সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে ছয় কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই চিঠির পর অভিযুক্ত কর্মচারীদের কয়েকজনকে বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে এনে বিরোধী মতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোণঠাসা করার যে প্রক্রিয়া তখন শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
৫০০ জনের নিয়োগেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
সমবায় অধিদফতরে প্রায় ৫০০ জনকে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই বড় নিয়োগকে ঘিরেও সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সিন্ডিকেটের বিরোধী কিংবা সৎ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ সংক্রান্ত একটি ফোনালাপের রেকর্ডের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ওই ফোনালাপে সাইফুল ইসলাম সজীব নামে এক ব্যক্তিকে একজন অতিরিক্ত নিবন্ধককে চাকরিচ্যুতির হুমকি দিতে শোনা যায়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সজীব আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং রামপুরায় ছাত্র হত্যা-সংক্রান্ত একটি মামলার আসামি। এ বিষয়ে একটি সিআর মামলার নম্বরও দিয়েছেন তারা। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্য অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
টেন্ডারে এখনও পুরোনো বলয়ের প্রভাব
অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কোনও পরিবর্তন আসেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কাজ পেতেন, তাদের অনেকেই এখনও একইভাবে টেন্ডার পাচ্ছেন।
তাদের দাবি, টেন্ডারের পাশাপাশি বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও পুরোনো বলয়ের প্রভাব রয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও একই ব্যক্তিদের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এ অবস্থায় অধিদফতরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু এখানে অনেক কিছুই আগের মতো চলছে। যারা আগে প্রভাবশালী ছিলেন, তাদের অনেকেই এখনও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।”
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে সমবায় অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে নাম আসা পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
অধিদফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :